নয়াদিল্লি: বিতর্কের মধ্যেই সংসদে ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ হল। বুধবার কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ করেন। সেখানে পূর্বতন UPA সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তোলেন রিজিজু। ২০১৪ সালের আগে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন UPA সরকার যেভাবে একের পর এক সম্পত্তি ওয়াকফকে ছেড়ে দিচ্ছিল, তাতে কিছুই রক্ষা পেত না বলে দাবি করেছেন তিনি। রিজিজুর দাবি, “UPA সরকার টিকে থাকলে, নরেন্দ্র মোদিজির সরকার না হলে, দেশের সংসদভবনও ওয়াকফ সম্পত্তি হয়ে যেত।” (Waqf Amendment Bill)
বুধবার সংসদে পূর্বতন UPA সরকারকে লাগাতার আক্রমণ করে যান রিজিজু। ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করছেন যাঁরা, তাঁদের মুসলিম বিরোধী হিসেবে গণ্য করা হবে বলে দাবি করেন তিনি। দক্ষিণের রাজ্যগুলিকে সতর্ক করেন রিজিজু। জানান, মন্দির-গির্জার সম্পত্তি পর্যন্ত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে যাতে সংসদভবনও ওয়াকফের সম্পত্তি না হয়ে যায়, তার জন্যই বিলে একাধিক সংশোধন ঘটিয়েছে তাঁদের সরকার। (Waqf Bill in Lok Sabha)
এখনও পর্যন্ত যা খবর, তাতে সংসদে ওয়াকফ বিল পাস করানো নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি। এই মুহূর্তে লোকসভায় বিজেপিৃর সাসংদ সংখ্যা ২৪০। কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন NDA সরকারের শরিক দলগুলির মধ্যে TDP, JDU ইতিমধ্যেই ওয়াকফ বিলকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। লোকসভায় TDP-র সাংসদ সংখ্যা ১৬, JDU-র ১২। অন্য শরিকদের ধরলে সবমিলিয়ে NDA-র সাংসদ সংখ্যা ২৯৫। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২ সাংসদের সংখ্যার চেয়ে বেশি। সেই নিরিখে কংগ্রেস এবং বিরোধী শিবির I.N.D.I.A-র সাংসদ সংখ্যা ২৩৪। ফলে বিল পাস করাতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কেন্দ্রের।
TDP নেতা এন চন্দ্রবাবু নায়ডু এবং JDU নেতা নীতীশ কুমার মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে চিন্তিত হলেও, JDU এখনই বিলটিকে আইন হিসেবে কার্যকর না করতে অনুরোধ জানিয়েছে। সামনেই বিহারে বিধানসভা নির্বাচন। সেই জন্যই নীতীশ এই আর্জি জানিয়েছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিহারে নির্বাচন হলেও ওয়াকফ বিল নিয়ে বদ্ধপরিকর কেন্দ্র। বরং এতে হিন্দু ভোট একত্রিত করা যাবে বলে মনে করছে গেরুয়া শিবির।
এখনও পর্যন্ত বিলটি পাস করার পক্ষে বিজেপি, JDU, TDP, লোক জনশক্তি পার্টি, শিবসেনা (একনাথ শিন্ডে)। অন্য দিকে বিলটির বিরোধিতা করছে কংগ্রেস, DMK, সমাজবাদী পার্টি, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি, তৃণমূল, আম আদমি পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সিপিএম, সিপিআই। ওয়াকফ সংশোধনী বিল নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য সংসদে আট ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়।
দলের সব সাংসদকে দুই কক্ষে হাজির থাকতে বলে হুইপ জারিও করেছে বিজেপি ও জোট সরকারের শরিক দলগুলি। বিলের বিরোধিতায় এককাট্টা কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল, আম আদমি পার্টি। গত বছর অগাস্ট মাসে লোকসভা ওয়াকফ বিল পেশ করা হলে তা যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয় বিচার-বিবেচনার জন্য। কিন্তু একতরফা ভাবে, অন্যায় ভাবে কমিটির চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন বলে অভিযোগ তোলা হয় বিরোধীদের তরফে। শেষ পর্যন্ত আজ বিলটি সংসদে পেশ করা হল।
এই ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল নিয়ে গোড়া থেকেই বিতর্ক। ওয়াকফ (সংশোধনী) বিলে বলা হয়েছে, ১) কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফ ঘোষণার অধিকার আর ওয়াকফ বোর্ডের হাতে থাকবে না, বরং জেলাশাসকরা সিদ্ধান্ত নেবেন। ২) ওয়াকফ বোর্ডে দুই মহিলা সদস্যের পাশাপাশি, দুই অমুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি রাখাও বাধ্যতামূলক। ৩) মুসলিম এবং অন্তত পক্ষে পাঁচ বছর ধরে যাঁরা ইসলাম ধর্ম পালন করে আসছেন, একমাত্র তাঁরাই ওয়াকফ বোর্ডকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। ৪) হিন্দু মন্দিরের মতো ওয়াকফ বোর্ডও ধর্মনিরপেক্ষ বিধিবদ্ধ সংস্থা বলে গন্য হবে। এর আগে লোকসভায় সংশোধনী বিলটি পেশ করা হলে, বিরোধীরা আপত্তি জানান।
কেন্দ্রের প্রস্তাবিত ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল নিয়ে বিরোধীদের দাবি, আসলে ওয়াকফ বোর্ডের গুরুত্ব খর্ব করাই এই বিলের লক্ষ্য। ওয়াকফ বোর্ডে মহিলাদের উপস্থিতির প্রস্তাবকে যদিও স্বাগত জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, অন্য ধর্মীয় সংস্থাগুলির বোর্ডে ভিন্ ধর্মের প্রতিনিধিদের স্থান নেই যেখানে, সেখানে ওয়াকফ বোর্ডের জন্য ভিন্ ধর্মের প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে কেন? অতি সম্প্রতি যদি কোনও ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে কেন সম্পত্তি দান করার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে কেন, এই প্রশ্নও তুলেছেন বিরোধীরা। অন্য ধর্মের বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। ওয়াকফ বোর্ডকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হতে হবে বলে প্রস্তাব দেওয়া হলেও, পুরীর মন্দিরে কেন অহিন্দুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বিরোধীরা। মুসলিমদের হাতে থাকা জমি কেড়ে নিতেই সংশোধনী বিল আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডও।
আরও দেখুন