ওই রাতে মেয়ের সঙ্গে যে ৪ জন ছিল, তারাও জড়িত, অন্তত ৫০ জন: নির্যাতিতার পরিবার

কলকাতা: রাত পোহালেই আর জি কর মামলায় সাজা ঘোষণা করবে আদালত। তার আগে এবিপি আনন্দে তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে ফের অসন্তোষ উগরে দিলেন নির্যাতিতার মা-বাবা। জানালেন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (CBI) হোক বা পুলিশ, কেউই সঠিক তদন্ত করেনি। ঘটনার রাতে তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে চারজন ছিলেন, তাঁরাও এই অপরাধে যুক্ত বলে দাবি করেছেন নির্যাতিতার মা-বাবা। সবমিলিয়ে ৫০ জন এই অপরাধে যুক্ত বলে দাবি তাঁদের। (RG Kar Verdict)
শনিবার শিয়ালদা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ধৃত সঞ্জয় রায়। সোমবার তার সাজা ঘোষণা রয়েছে। সর্বোচ্চ ফাঁসি এবং সর্বনিম্ন যাবজ্জীবনের সাজা হতে পারে সঞ্জয়ের। কিন্তু সঞ্জয়ের সাজা হলেই ন্যায়বিচার হয়ে গেল বলে মনে করছেন না নির্যাতিতার মা-বাবা। তদন্তে অনেক গাফিলতি রয়ে গিয়েছে, অনেক কিছুই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি বলে মত তাঁদের। (RG Kar Victims Family)
রবিবার এবিপি আনন্দের মুখোমুখি হয়ে নির্যাতিতার বাবা জানান, সঞ্জয় যে অপরাধী, তা প্রমাণিত। সঞ্জয়ের মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত। আদালতে সঞ্জয় নিজেকে যে নির্দোষ বলে দাবি করেছে, রুদ্রাক্ষের মালার দোহাই দিয়েছে, তাও মানতে নারাজ নির্যাতিতার মা-বাবা। নির্যাতিতার মা বলেন, “ও বলেছে ঘটনাস্থলে থাকলে রুদ্রাক্ষের মালা ছিঁড়ে যেত। এটা নিছক কথার কথা। ও কী করে জানল আমার মেয়ে সেমিনার রুমে ঘুমাচ্ছে? কে পাঠাল ওকে? কেন এই অপরাধ ঘটাল? কিছুই বলেনি ও। বলছে, ‘আমি গরিব বলে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। আর যরা অন্যায় করল, তারা কি ছাড়া পেয়ে যাবে’? আর কারা জড়িত ছিল? তুই যদি জানিস, সত্যিটা বল! সেটা তো বলছে না!”
ঘটনার রাতে চার সহকর্মীর সঙ্গে নির্যাতিতা একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, ওই চারজনও এই ঘটনায় যুক্ত। নির্যাতিতার মা বলেন, “কোথায় আমার মেয়েকে খুন করা হল, সেটাই ঠিকঠাক বের করতে পারেনি এখনও। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মিথ্যে বলছে। যে চারজন আমার মেয়ের সঙ্গে ছিল, মিথ্যে বলছে তারাও। এর বড় প্রমাণ হল, ওরা বলছে ৯.৩০টায় দেখেছে। তারণ তত ক্ষণে মিডিয়া জেনে গিয়েছে যে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। খুন, ধর্ষণ না জানলেও, দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জেনে গিয়েছিল সকলে। অথচ ওরা বলছে ৯.৩০টায় দেহ দেখেছে। কেন মিথ্যে বলছে? সুমিত রায় তরফদার…ওরা জড়িত বলেই মিথ্যে বলছে। ওরা আমার মেয়ের সঙ্গে ছিল। ওদের আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত ছিল।”
পুলিশ বা CBI, কেউই সঠিক তদন্ত করেনি বলে অভিযোগ করেছেন নির্যাতিতার মা-বাবা। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের মধ্যে ছিল তাঁদের মেয়ে। এত ডাক্তার, নার্স, কর্মী রয়েছেন। সেখানে বাইরে থেকে সঞ্জয় এসে ওই ঘটনা ঘটিয়ে গেল কী ভাবে? হাসপাতালের লোকজনের মদত না থাকলে, এটা সম্ভব নয় বলে মত তাঁদের। নির্যাতিতার বাবা জানান, কেউ মৃত না জীবিত, তা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখাই নিয়ম। কিন্তু তাঁর মেয়ে জীবিত না মৃত, তা মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে দেখা হয়। গোড়া থেকেই ধোঁয়াশা রেখে দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও অনেক অসঙ্গতি রয়েছে।
যিনি ফরেন্সিকে রয়েছেন, তিনি বিরাট বড় ডাক্তার। কিন্তু তিনিও ঠিক লেখেননি রিপোর্ট। ওঁকেও হেফাজতে নিয়ে CBI-এর জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত বলে দাবি নির্যাতিতার মা-বাবার। তাঁদের মতে সঞ্জয় অবশ্যই দোষী। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ লোপাট-সহ আরও অনেকে এই ঘটনায় যুক্ত। তাঁদের সামনে আনা যেত। যিনি ফোন করে আত্মহত্যার কথা জানিয়েছিলেন তাঁদের, কলকাতার প্রাক্তন সমিশনার বিনীত গোয়েল, এসপি, হোমিসাইড বিভাগ…যাঁরা তথ্যপ্রমাণ লোপাটে জড়িত, সকলের কঠোর সাজার দাবি করেছেন নির্যাতিতার মা-বাবা। নির্যাতিতার মা বলেন, “৫-৬ জন মিলে যদি আমার মেয়েকে মেরে ফেলে, প্রথম থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত, চুল্লিতে ঢোকা পর্যন্ত ধরলে কমপক্ষে ৫০ জন দোষী গ্রেফতার হবেন।”
নির্যাতিতার মা বলেন, “কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ আমাদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেননি। অথচ আমাদের স্থানীয় বিধায়ক, পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন জুবিলি বিল্ডিংয়ে। কী বৈঠক হল? আমাদেরও যেতে জোর করা হয়েছিল। আমরা যাইনি। তখন বলা হয় সাদা কাগজে সই করে দিতে। বলা হয়, সাহেব যা লেখার লিখে নেবেন। সারিফ হাসান স্বীকার করেছে, সন্দীপ ঘোষের নির্দেশে ও আমাদের পাহারা দিচ্ছিল। কর্তব্যরত ডাক্তার আত্মহত্যা করেছে বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমরা বার বার CBI-কে সারিফ এবং মৌতৃষা গড়াইয়ের নাম বলেছি। কিন্তু CBI জিজ্ঞাসাবাদ করেনি ওদের। করলেও চার্জশিটে তার প্রতিফলন নেই। এতেও তদন্ত নষ্ট হয়েছে।”
আরও দেখুন